Published : 01 Jan 2026, 05:09 AM
ইসলামী চিন্তাধারায় ‘ইলহাম’ একটি গভীর এবং সূক্ষ্ম ধারণা। প্রায়শই মানুষের মনে হঠাৎ করে কোনো ভালো কাজ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, সত্যের ঝলকানি অথবা সঠিক পথে চলার অনুভূতি জাগে—সাধারণভাবে একেই ‘ইলহাম’ বলা হয়। তবে ইসলামে ইলহামের অর্থ, এর পরিধি এবং গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা জরুরি। ‘ইলহাম’ শব্দটি আরবি ‘লাহামা’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো হৃদয়ে কিছু প্রবেশ করানো, কোনো বিষয় মনে গেঁথে দেওয়া অথবা হঠাৎ করে মনের মধ্যে কোনো অনুভূতির উদয় হওয়া। অর্থাৎ, ইলহাম হলো এমন একটি বিষয় যা মানুষের মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, এর জন্য কোনো বাহ্যিক শিক্ষা বা চেষ্টার প্রয়োজন হয় না। কোরআনে সরাসরি ‘ইলহাম’ শব্দটি একবার ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, “অতঃপর আল্লাহ তাকে মন্দ ও ভালো কাজের জ্ঞান দান করেছেন।” (সূরা শামস, আয়াত: ৮)। তাফসিরবিদগণ বলেন, এখানে ‘জ্ঞান দান’ বলতে মানুষের মনে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা সঞ্চার করা হয়েছে—যা ইলহামের মূল ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ইসলামে ইলহামকে ওহির সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ওহি শুধুমাত্র নবীগণের জন্য প্রযোজ্য। একজন নবী নন এমন মানুষও ইলহাম পেতে পারেন।
ইলহাম মূলত তিন ধরনের হতে পারে: আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কল্যাণকর অনুপ্রেরণা, মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও মানসিক প্রবণতা, অথবা শয়তানের কুমন্ত্রণা। এই কারণে, শুধুমাত্র “ভালো লাগছে” বা “মনে হচ্ছে” – এই যুক্তিতে ইলহামকে শরীয়তের দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, ইলহাম শরীয়তের উৎস নয়। কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত কোনো ইলহাম গ্রহণযোগ্য নয়। ইলহাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইমাম গাজালি বলেন, যদি ইলহাম কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে সঠিক হয়, তবে তা গ্রহণীয়; অন্যথায় তা বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। (ইহইয়াউল উলুমিদ্দিন)। হাদিসে কিছু সাহাবীর অন্তরজ্ঞান বা উপলব্ধি পরবর্তীতে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে, হযরত উমর (রা.) সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে এমন ব্যক্তি ছিলেন, যাদের অন্তরে সত্য প্রেরণা দেওয়া হতো। যদি আমার উম্মতে কেউ হন, তবে তিনি হলেন উমর।” (সহিহ বুখারী, হাদিস: ৩৬৮৯)।
এটি প্রমাণ করে যে ইলহাম হওয়া সম্ভব, তবে তা নবুয়তের সমতুল্য নয়। অনেকে ইলহাম ও কাশফকে এক মনে করেন, যা সঠিক নয়। ইলহাম হলো অন্তরের অনুভূতি বা অনুপ্রেরণা, অন্যদিকে কাশফ হলো আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দাবি। ইসলামে উভয়ই শরীয়তের অধীন; কোনোটিই স্বাধীন দলিল নয়। ইলহাম বিষয়ে ইসলামের অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ—একে পুরোপুরি অস্বীকার করা হয় না, আবার অন্ধভাবে অনুসরণও করা হয় না। কুরআন ও সুন্নাহর বাইরে গিয়ে ইলহামের দাবি করা হলে তা বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত আকিদার জন্ম দিতে পারে। সংক্ষেপে বলা যায়, ইলহাম হলো মানুষের অন্তরে উদিত এক ধরনের অনুভূতি বা অনুপ্রেরণা, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসতে পারে, অথবা মানুষের নিজস্ব চিন্তা বা শয়তানের প্ররোচনাও হতে পারে। তাই ইসলামে ইলহামকে কখনোই শরীয়তের মূল উৎস হিসেবে ধরা হয়নি। কুরআন ও সুন্নাহই চূড়ান্ত মানদণ্ড; ইলহাম কেবল তার আলোকে যাচাইযোগ্য একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি মাত্র।।
ডিপিডিসি প্রকল্পের বাইরে কর্মকর্তাদের জন্য বিলাসবহুল আবাস: সুইমিং পুল ও জিমসহ টুইন টাওয়ার নির্মাণ