Published : 07 Jan 2026, 09:06 AM
দেশের পথগুলোতে মৃত্যুর মিছিল ক্রমশ বাড়ছে, যা এক ভয়ংকর বাস্তবতার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও আহতদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং এটি নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্বহীনতার সুস্পষ্ট প্রকাশ। ২০২৫ সালে ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন মানুষের জীবনহানি এবং প্রায় ১৫ হাজার মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়; এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৩৮ শতাংশ মৃত্যুর কারণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। মোটরসাইকেলকে গণপরিবহন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত আজ নাগরিকদের জীবন দিয়ে দিতে হচ্ছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে মিলিয়ে গত এক বছরে ৭ হাজার ৩৬৯টি দুর্ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের প্রাণহানি উন্নয়নশীল যেকোনো দেশের জন্যেই মর্মান্তিক। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্পে অবকাঠামো, সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে আর মেগা প্রকল্পের লম্বা তালিকা থাকলেও সড়কনিরাপত্তার বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিবের মতে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানের চেয়ে প্রকৃত চিত্র পাঁচগুণ বেশি ভয়াবহ।দুর্ভাগ্যবশত, সড়কনিরাপত্তা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নেই। আমরা আশা করি, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়কনিরাপত্তা, গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার এবং যাত্রী অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবে। প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যে সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারায়, তা অনেক সময় বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বেশি। অথচ এই মৃত্যু যেন ভোটের রাজনীতিতে কোনো মূল্য পায় না। যাত্রীকল্যাণ সমিতি ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করা, সড়কনিরাপত্তার জন্য বাজেট বৃদ্ধি করা এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা। এই সুপারিশগুলো প্রশাসনের জরুরি মনোযোগের দাবি রাখে। এগুলো বাস্তবসম্মত, কার্যকর এবং দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। যদি সড়কনিরাপত্তাকে এখনই জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা না হয়, তাহলে উন্নয়ন ও জনকল্যাণের সব দাবি মানুষের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়বে।আমরা আশা করি, সরকার, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সড়ক, নৌ ও রেলপথের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদাসীনতার পথ পরিহার করবে। আমাদের বিশ্বাস, যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। এর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সড়কে মৃত্যুর এই মিছিল যে কোনো মূল্যে থামাতে হবে।।