Published : 08 Apr 2026, 07:11 PM
ইমানা আর নিহা ছিল প্রাণের বন্ধু। প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হলেই তারা বাবা-মায়ের সাথে মেলায় যেত। তারা দুজনে মিলে পছন্দের বই খুঁজে বের করত, আর একে অপরের জন্য উপহার কিনত। একদিন তাদের শিক্ষিকা নাজমা ম্যাডাম বলেছিলেন, “বই পড়লে মনের দরজা খুলে যায়, আর সেই দরজা দিয়ে দেখা যায় পুরো পৃথিবী।” শুনে দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নিল, তারা বইয়ের জগতে ডুব দেবে। ইমানা-নিহা ক্লাসের ফাঁকে বই পড়া নিয়ে আলোচনা করত। ইমানা স্কুলের লাইব্রেরি ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ত এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে পুরস্কারও জিতেছিল। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর স্কুলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হবে। ইমানা ভাবছিল, ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ অনুষ্ঠানে সে কোন চরিত্রে অভিনয় করবে। নিহা বলল, “তুই ‘বইপোকা’ বা ‘বইয়ের ভূত’ সেজে পারিস।” ইমানা হেসে বলল, “আমি উইপোকা সেজে বই কাটব, আর তুই ভূত সেজে বই গিলে খাবি!” কিছুক্ষণ হাসাহাসির পর নিহা বলল, “শিশুরা ভয় পাবে, এমন কিছু করা ঠিক না।” স্কুল ছুটির পর তারা দুজনে ইমানার বাড়ি ফিরল। ইমানা তার নানাভাইকে জিজ্ঞেস করল, “নানাভাই, ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’তে আমি কী সেজে অভিনয় করতে পারি?” নানাভাই মনোযোগ দিয়ে গল্পের বই পড়ছিলেন। পাশে সুবহানা, বর্ণ ও জায়ান মোবাইল নিয়ে গেমস খেলছিল এবং টিকটক তৈরি করছিল। নানাভাই বাইরের পরিবেশের দিকে খেয়াল রাখতেন না।
ইমানা তার কানে গিয়ে চিৎকার করে বলল, “নানাভাই!” নানাভাই তখন সম্বিত ফিরে পেলেন। ইমানা বলল, “আমি স্কুলে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’তে অভিনয় করব, কী সেজে করব বলো?” নানাভাই ‘পরীর দিঘিতে ভূতের জাহাজ’ বইয়ে একটি লাইন মার্কার দিয়ে চিহ্নিত করলেন—‘শিশুদের হাতে মোবাইল নয়, বই তুলে দিন’। কিছুক্ষণ ভেবে তিনি বললেন, “পেয়ে গেছি!” “কী?” ইমানা জানতে চাইল। নানাভাই বললেন, “তুমি বইয়ের ফেরিওয়ালা সেজে পারো।” ইমানা একটু চুপ থেকে বলল, “নানা, আমি কি বই বিক্রি করব? আমি কি বইয়ের হকার হব?” নানাভাই বললেন, “না, তুমি বইয়ের পুঁটলি নিয়ে গ্রামে গ্রামে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে বইপ্রেমীদের মাঝে বিতরণ করবে। বই পড়া শেষ হলে সেগুলো আবার সংগ্রহ করে আনবে। তোমার কাঁধে থাকবে বইয়ের থলে, হাতে প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকবে—‘বইয়ের বার্তাবাহক—আপনার সন্তানের হাতে মোবাইল নয়, বই তুলে দিন’। আর হ্যান্ডমাইকে চিৎকার করে বলবে—‘বই লাগবে, বই? মজার গল্প, কবিতা, ছড়ার বই আছে।’” ইমানার এই আইডিয়াটি খুব পছন্দ হলো। জায়ান ও বর্ণ বলল, “নানাভাই, আমরাও বইয়ের বার্তাবাহক হব, বই বিক্রি করে আইসক্রিম, চকলেট খাব।” ইমানা তার ছোট ভাইবোনদের বলল, “এই মোবাইলগুলো দাও, গিয়ে বই পড়তে বসো।” সুবহানা বলল, “আমি এখন থেকে মোবাইল দেখব না।” পরের দিন স্কুলে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ অনুষ্ঠানে ইমানা নীল শাড়ি পরে বইয়ের বার্তাবাহক সেজে উঠল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শিক্ষিকা ও সহপাঠীরা বইয়ের জন্য তার চারপাশে ভিড় করল।
অভিভাবকেরাও মাঠে দাঁড়িয়ে বইয়ের বার্তাবাহকের কাছ থেকে বই নিতে চাইলেন। ইমানা হাসিমুখে সবাইকে বই দিল। অভিনয় শেষে প্রধান শিক্ষক বললেন, “শিশুদের কাছ থেকে বড়দের অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা বড়রা তাদের সামনে মোবাইল নিয়ে বসে থাকি, যা তারা নকল করে। বড়রা যদি হাতে বই নিয়ে পড়ে, তাহলে শিশুরাও বই পড়তে উৎসাহিত হবে। ইমানা অভিনয়ের মাধ্যমে শিখিয়ে দিয়েছে, শিশুদের হাতে মোবাইল নয়, বই তুলে দিন। বই হলো মনের ওষুধ।” কিছুক্ষণ পর ফলাফল ঘোষণা করা হলো। স্পিকারে ঘোষণা করা হলো, ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে ইমানা। সবাই করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানালো। দূরে দাঁড়িয়ে নানাভাই করতালি দিলেন। জায়ান, বর্ণ ও সুবহানা কানে কানে বলল, “আজ থেকে আমরা আর মোবাইল দেখব না, বই পড়ব। ইমানা আপুর মতো আমরাও পুরস্কার পাব।” উপদেষ্টা, পটিয়া বন্ধুসভা।।